ঈদের সেরা দশ নাটক

১) আশ্রয়ঃ

অনেক নিঃসন্তান দম্পতিই তো বেবি এডাপ্ট করান।কিন্তু পিতা-মাতাহীন দম্পতি বাবা-মা এডাপ্ট করানোর বিষয়টা দারুন ছিল। মুন্না ভাইয়ের মাথায় এ আইডিয়া কীভাবে এল জানা নেই।বাট,অসাধারণ একটি আইডিয়া।

শুরুতেই দেখা যায় তাহসান-তিশার সুখের পরিবার।এক পরীর মত ছোট্ট মেয়ে আছে তাদের।এত পূর্ণতার মাঝেও কি যেন এক অপূর্ণতা।
একদিন মেয়েটি স্কুলে তার এক সহপাঠী থেকে জানতে পারে দাদা-দাদী সম্পর্কে।বিস্ময়ে সে বাসায় এসে জানায় দাদা-দাদী কি? উল্লেখ্য যে, তাহসান আর তিশা দুজনেই এতিম ছিলেন।মেয়ের প্রশ্ন যেন নিয়ে গেল তাদেরকে তাদের এতিম শৈশবে।শেষ পর্যন্ত নানান ঘটনার মাধ্যমে তারা বাবা হিসেবে মোশাররফ করিম কে এডাপ্ট করান।যদিও তিনি শুরুতে রাজি ছিলেন না।কিন্তু ছোট্ট সোনামনির ছবি দেখে রাজি হয়ে যান তার দাদা হতে।

তাহসান-তিশা লক্ষ্য করেন মোশাররফ করিম মাঝে মাঝে আনমনা হয়ে যান।কি যেন ভাবেন উদাস হয়ে।তারা তাকে জিজ্ঞেস করেন তার এ আনমনা হওয়ার কারন।জানা যায় তার জীবনের এক করুন কাহিনী।
সন্তানদের অবহেলা,তাদেরকে বোঝা ভাবা আর বৃদ্ধাশ্রমে রেখে আসা।স্ত্রী থেকে তার বিচ্ছিন্নতা। শেষে তাহসান তিশা নিয়ে আসেন মোশাররফ করিমের স্ত্রী জাকিয়া বারি মম কে।পূর্ণ হয় পরিবার।এমন সময় নিজেদের ভুল বুঝতে পেরে অনেক বছর পর ফিরে আসে সন্তানেরা বাবা মা কে নিয়ে যেতে। কি হয় তার পরে, তা দেখতে হলে নাটকটি দেখতে হবে।।

টিভিতে এর স্ক্রিনটাইম ছিল ৫০ মিনিট।আর ইউটিউবে ৬৬ মিনিট।কোন সন্দেহ ছাড়াই ঈদের সেরা নাটক বলা চলে একে।ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক,সাউন্ড কোয়ালিটি,অভিনেতা-অভিনেত্রীদের নৈপূন্য আর ছোট্ট মামুনির অসাধারণ অভিনয়।কোন অপূর্ণতাই খুজে মিলবে না।ভাবতে বাধ্য করে দেয় নতুন করে।পরিবারকে আরো একবার ফিল করায়।

ফ্যামিলি ড্রামা তৈরী হয়না বলে দর্শকদের এতদিন যে হতাশা ছিল তা যেন পূর্ণ করে দিয়েছে আশ্রয়।

নাটকের লিংকঃ https://www.youtube.com/watch?v=hHlEx5cY5P0&t=4s

২) আমাদের সমাজবিজ্ঞানঃ

ছোট বেলার স্বপ্ন গুলো বড় হওয়ার সাথে সাথে হারিয়ে যায়।সবাই লিপ্ত হয় এক ইদুর দৌড়ে।আমরা যত বড় হই আমাদের স্বপ্ন গুলো তত ছোট হয়ে যায়।
এর কারন কি?আমাদের সমাজ ব্যবস্থা নিঃসন্দেহে।যেখানে সবাই ভাবে সন্তান ডাক্তার/ইঞ্জিনিয়ার না হলে ইজ্জত থাকবে না।আর পরে যুক্ত হয় বিসিএস প্রতিযোগিতা।

এমন ঘটনা ঘটেনি কার জীবনে?গল্পের একেকটা ক্ষণে নিজেকে আবিষ্কার করবেন।মনে হবে এ তো নাটক নয়,আমারই জীবনের গল্প।এখানেই এর স্বার্থকতা।
সব মিলিয়ে একটা মাস্টারপিস।

৩)মুগ্ধ ব্যাকরণঃ পরিবারে স্বামী স্ত্রীর ঝগড়া শিশুদের উপর কেমন ইফেক্ট ফেলে তা ফুটে উঠেছে এ নাটকে।মোশাররফ করিম আর মম এর সংসারে আছে এক ছেলে।তারা সারাদিন দুজনে ঝগড়া করে।কেউই কম্প্রোমাইজ করতে রাজি নয়।তাদের এ ঝগড়ার ইফেক্ট পড়তে থাকে তাদের বাচ্চার আচার আচরনে।তার মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্থ হয়ে যায়।

প্রতিটা পরিবারের প্রতি এ নাটক একটা বার্তা দিয়ে যায়।বিশেষ করে যে পরিবারে ছোট্ট শিশু আছে।ঈদের অনেক আন্ডার রেটেড একটা নাটক হলেও৷ আমার লিস্টের শীর্ষে থাকবে এটি।বিন্দুমাত্র বোর হওয়ার সুযোগ নেই কোথাও।

নাটকের লিংকঃ https://www.youtube.com/watch?v=2LopZll_Hl0

৪) কিংকর্তব্যবিমূঢ়ঃ

ম্যাজিক দেখানো পেশা চঞ্চল চৌধুরীর।সে খালি বক্স থেকে বিভিন্ন জিনিস বের আনে।হঠাৎই একদিন ম্যাজিক দেখানো কালে এক শোতে তার খালি বক্স থেকে বেরিয়ে আসে একটি বাচ্চা।দর্শকরা মজা পেয়ে হাত তালি দেয়।যা দেখে চঞ্চল প্রকাশ করেনা কারো সামনে যে এটা ম্যাজিক পার্ট না।বরং বাহবা পেয়ে খুশি হয়।তখন তিশাকে যেভাবে দেখানো হয়েছিল জাস্ট এম্যেজিং।

সময়ের সাথে সাথে চঞ্চলের মাঝে অস্থিরতা তৈরী হতে থাকে।জন্ম নেয় অস্বস্তি।দর্শকদেরও অস্বস্তি কাজ করবে শেষে কি হয় জানার জন্য।

অনেক দিন পর ফাহমি ফিরে দেখিয়ে দিলেন যে এত বছর নাটক নির্মান না করলেও কেন তাকে নিয়ে এত আলোচনা।এ নাটকটিকে লিস্ট থেকে বাদ দেয়ার কোন উপায় নেই।

৫) এই শহরেঃ

আমাদের এই শহরে বেচে থাকার জন্য মানুষ কত কিছুই না করে।কত পেশাতেই না কাজ করে তারা।শুধু জীবিকার জন্য কেউ কেউ অপরাধের পথে লিপ্ত হয়।এই শহরে নাটকে তেমনি এক চরিত্রে দেখা যায় আফরান নিশো এবং মেহজাবিনকে।

মেহজাবিন নার্সের ছদ্মবেশে সদ্য ভূমিষ্ট বাচ্চা চুরি করে।তার স্বামী সে বাচ্চা নিয়ে দেয় এক দালালকে।দালাল বিক্রি করে বড়লোক/আরবের শেখদের কাছে।একবার এক বাচ্চা নিয়ে যেতে দেরী হওয়ায় পার্টি হাতছাড়া হয়ে যায়।বাচ্চার লালনের দায়িত্ব নিশো দেয় মেহজাবিনকে পরবর্তী পার্টি না আসা পর্যন্ত। কিন্তু মেহজাবীন সে বাচ্চাকে লালন করতে গিয়ে নিজের মধ্যে থাকা মাতৃত্বের টান খুজে পায়।এভাবেই এগিয়ে চলে নাটক।।

শেষ দিকে সে যখন বলে,’জেলে নিয়ে কি হবে?জনগণকে ডাকুন।আমাকে মেরে ফেলুক।আমি তো একটা চুর’!
দারুন ছিল।।

নাটকের লিংকঃ https://www.youtube.com/watch?v=W7jEAv9Xhss

৬) একটু পর রোদ উঠবেঃ

A mother can do everything for her children. এ নাটকটিতে দেখা যায় মায়ের একমাত্র সন্তান ফারহান।সে গ্রাম থেকে শহরে আসে জীবিকার জন্য।কিন্তু দোষ না করেও সে একটি সন্ত্রাসী হামলার আসামী হিসেবে ফেসে যায়।
তার মা তিশা খবর শোনে গ্রাম থেকে শহরে চলে আসে।শুরু হয় এক মায়ের লড়াই। একজন মা তার সন্তানকে বাচাতে কত কিছু করতে পারেন তা এ নাটকে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। আন্ডার রেটেড নাটকগুলির একটি হলেও এটা টপ টেনে জায়গা করে নিবেই যারা দেখবেন।।

৭) লাইফ ইন্স্যুরেন্সঃ 

আবারো এক মায়ের আত্মত্যাগের গল্প।

শুরুতেই দেখা যায় অপূর্ব একটি জীবন বীমা করছে।৪ বছর পর তার জব করা কোম্পানিটি বন্ধ হয়ে যায়।সে তার পরিবার নিয়ে পড়ে সংকটে।অবশেষে এলাকার এক বড় ভাইয়ের মাধ্যমে একটি কাজ পায় সে। কাজটি মানুষকে কনভেন্স করে মানি ডেপোজিট করানোর।৷ এলাকার সবার বিশ্বস্ত ও ভাল একটা পরিচয় আছে বিধায় তার কথায় মানুষ বিশ্বাস করে।তারপরই জালিয়াতির শিকার হয়ে বদলে যায় সব কিছু।। এবিং৷ শেষ পর্যন্ত কি হয় তা দেখতে হলে নাটকটি দেখতে হবে।

৮)বাহাইন্ড দ্যা পাপ্পিঃ পিন্টো-মিন্টো সিরিজ ভালবাসেনা এমন কোন নাট্যপ্রেমী খুজে পাওয়া যাবেনা।
রেদোয়ান রনি আবারো ফিরে এসেছেন তার বিখ্যাত পিন্টো-মিন্টো সিরিজ নিয়ে।এ সিরিজ নিয়ে বলার মত নতুন কিছু নেই।বরাবরের মতই অসাধারণ।
অশ্লীলতা ছাড়াও যে বিনোদন নির্ভর নাটক বানানো যায় তা হালের অনেককেই শিখাতে পারে এ নাটকটি।অনেক দিন পর মোশাররফ -ফারুক দুজনকে দেখা।আবারো সেই ক্যামিস্ট্রি। টপ টেনে না রেখে উপায় নেই।

নাটকের লিংকঃ https://www.youtube.com/watch?v=u8-FZvZ8hrQ

৯) উবারঃ

বাবারা বট বৃক্ষের মত।পরিবারকে নীরবে ছায়া দিয়ে যান।কিন্তু কখনো সন্তান সেটা বুঝতেই পারেনা। উপরন্তু তাদেরকে ভুল বুঝে সব সময়।বাবারা অনেকটা নারিকেলের মত।বাহিরটা শক্ত খোলসে ভরা হলেও ভেতরে অমৃতরূপী জল।

তৌসিফ-সাবিলা পালাতে যায়।সাবিলার ধারনা বাবা মা তাকে ভালবাসে না।
কিন্তু সে জানেনা তার বাবা মা তাকে কতটা ভালবাসে। বাবা নামক মানুষটি বট বৃক্ষের মত নীরবে ছায়া দিয়ে যায়।মেয়ের স্কুটি কেনার জন্য টাকা যোগার করতে অফ ডেতে ওভার চালায়।

তৌসিফ-সাবিলা যে গাড়িটিতে করে পালাতে যায়।সে গাড়ির ড্রাইভার সাবিলার বাবা। এভাবেই এগিয়ে যায় গল্প। শেষ পর্যন্ত দেখলে মুগ্ধ হবেনই।

নাটকের লিংকঃ https://www.youtube.com/watch?v=6aRbwpgz39o&t=1s

১০) দরজার ওপাশেঃ

আচ্ছা আন্টি? ধর্ষন কি?
ছোট্ট মেয়ের এমন প্রশ্নে চমকে যায় তার আন্টি।বুকে টেনে নেন তাকে।তাকে কি উত্তর দিবেন তিনি?

সেদিন গাড়িতে একটা মেয়েকে হাত নাড়াতে দেখেন অল্পক্ষনের জন্য।তারপরই গাড়িটি চলে যায়।পিছু নেয়া হয়না।পরদিন দেখা যায় ধর্ষনের খবর এসেছে সে মেয়ের।ধর্ষন করে হত্যা।যা আমাদের দেশে জঘন্য হারে বাড়ছে।

সিদ্ধান্ত নেন তিনি খুজে বের করবেন ধর্ষকে/দের।শাস্তি দেবেন।অপি করিম দূর্দান্ত অভিনয় করেছেন।পুলিশ অফিসার হিসেবে দায়িত্বে কঠোর হওয়া আর পরিবারের প্রতি মায়া দুইয়ের মিশেলে অনন্য হয়ে উঠে নাটকটিন্তার উপর থ্রিলিং ভাব।।
সব মিলিয়ে আরো কিছু ভাল নাটককে বাদ দিয়ে এটিকে সেরা দশে রাখার সিদ্ধান্ত নিলাম।।
.
ব্যক্তিগত মতামত গুলো ততক্ষণই ব্যক্তিগত থাকে,যতক্ষণ তা ব্যক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে।যখনই তা পাবলিক প্লেইসে শেয়ার করা হয় অথবা কোন কম্যুনিটিতে প্রকাশ করা হয়,তখন তা আর পুরোপুরি ব্যক্তি কেন্দ্রিক থাকেনা। তবুও নিজের মতামতটুকু প্রকাশ করছি।আপনারা চাইলে কমেন্ট বক্সে যৌক্তিক আলোচনা করতে পারেন।।

সবার পছন্দ এক নয়।ব্যক্তিমাত্রই ভিন্ন মত,চিন্তা ও মানসিকতার অধিকারী। বেশ কিছু নাটক ভাল লাগার পরেও টপ টেনে রাখা সম্ভব হয়নি।এ ঈদে যেন ভাল লাগা ভাল নাটকের সংখ্যা একটু বেশীই।
তাই কমেন্ট বক্সে এখানের বাদ যাওয়া নাটকগুলো আপনাদের চিন্তায় কোনটি টপ টেনে আসতে পারে জানাবেন।এবং অবশ্যই এ দশটি নাটক দেখা হলেই তারপর বলবেন।কারন,অল্প বিদ্যা বরাবরই ভয়ানক।।

লিখেছেনঃ আখলাকুজ্জামান সাকিব


Leave a Reply